বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩০ অপরাহ্ন
অনুসন্ধান ২৪ >>বরিশালের কথিত অভিভাবক আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং পুলিশের উচ্চপদস্থ দুই কর্মকর্তাসহ ৪০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে।
৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা হাসানাত আব্দুল্লাহ এবং তার ছেলে-সন্তনেরা কোথায় আছেন, তার কোনো হদিস নেই। ওই দিন শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর হাসানাত আব্দুল্লাহ’র কালিবাড়ির বাড়িটি পুড়িয়ে দেওয় উত্তেজিত জনতা, সেখান থেকে বরিশাল সিটির সাবেক প্যানেল মেয়র গাজী নঈমুল ইসলাম লিটুসহ তিনজনের দগ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। জানা গেছে, লিটু হাসানাতপুত্র সাবেক সিটি মেয়র ও বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র আস্থাভাজন ছিলেন। মূলত ওই ঘটনার পর থেকে হাসানাত আব্দুল্লাহসহ তাদের পরিবারের কারও কোনো খোঁজ নেই।
মঙ্গলবার (৮ অক্টোবর) অপরাহ্নে বরিশালের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট গৌরনদী আমলি আদালতে মামলার আবেদন করা হলে বিচারক তা এজাহার হিসেবে গ্রহণ করতে পুলিশকে নির্দেশনা দেন। একইদিনে সাবেক এমপি বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল্লাহসহ তার গোটা পরিবারের ব্যাংক হিসেব জব্দ করার নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। একইসঙ্গে তার পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তি-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবও স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে।
তবে বিভিন্ন মাধ্যম নিশ্চিত করেছে, বরিশালের কথিত বা অঘোষিত অভিভাবক হাসানাত আব্দুল্লাহ সরকার পতনের আগেই ভারতের দিল্লিতে অবস্থান নিয়েছেন। এবং তিনি সেখানেই মেয়ে কান্তার কাছে নিরাপদে আছেন। আবার কারও কারও হাসানাত আব্দুল্লাহ ছেলে-সন্তানদের নিয়ে দেশের অভ্যন্তরেই কোথাও আত্মগোপনে রয়েছেন। কারণ ৫ আগস্টের পরেও তার ছেলে মঈন আব্দুল্লাহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন উপদেষ্টার ছেলেকে নিয়ে বরিশালে এসেছিলেন এবং তাদের কালিবাড়ির পোড়া বাড়িটি পরিদর্শন করেন।
আরেকটি সূত্র বলছে, হাসানাত আব্দুল্লাহ ছেলে-সন্তানদের নিয়ে গোপালগঞ্জেও থাকতে পারেন এবং সেখান থেকে দেশত্যাগের একটি ছক আঁটছেন। এসব আলোচনার মধ্যেই মঙ্গলবার বরিশাল আদালতে হাসানাত আব্দুল্লাহসহ বরিশালের সাবেক ডিআইজি হুমায়ুন কবির এবং সাবেক এসপি এহসান উল্লাহসহ ৪০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হলো, যা এজাহার হিসেবে গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট আগৈলঝাড়া থানা পুলিশকে নির্দেশ দিলেন বিচারক।
মামলার বরাতে বাদীর আইনজীবী জাহিদুল ইসলাম পান্না জানান, আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহসহ মামলার আসামিরা এলাকাকে নৈরাজ্যের জনপদে পরিণত করেন। রাজনৈতিকভাবে বাদীর বাবা কবির হোসেন রনি ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। আসামি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রতিহিংসার কারণে বাদীর বাবাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্দেশনার আলোকে পুলিশ কর্মকর্তারা ২০১৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদল নেতা রনিকে ঢাকার নবীনগর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। এবং পরবর্তীতে ছাত্রদল নেতাকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাত আড়াইটার দিকে আগৈলঝাড়া উপজেলার বাইপাস ব্রীজের পশ্চিম পাশে রাস্তায় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে সকল আসামিরা বিষয়টি একযোগে ক্রসফায়ার নামে প্রচারণা চালায়। এতোদিন ভয়ে মামলা করতে না পারলেও ঘটনার ৯ বছর পর বাবা হত্যার বিচার চাইলেন ছেলে আশিকুর রহমান আসিফ।
আলোচিত হাসানাত আব্দুল্লাহ স্বৈরাচ্চার শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই, তিনি এই পরিচয়ে এক যুগের বেশি সময় ধরে বরিশালে একক রাজত্ব করেছেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা, জবরদল, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, কমিশন বাণিজ্যসহ বহুমুখী অভিযোগ আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠিয়েছে। হিসাব জব্দ করা ব্যক্তি ও তার ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের হিসাব স্থগিত থাকবে। আগামী ৩০ দিন এসব হিসাবে কোনো ধরনের লেনদেন করতে পারবে না। প্রয়োজনে লেনদেন স্থগিত করার এ সময় বাড়ানো হবে।
এরই মধ্যে পলাতক এই তথাকথিত অভিভাবকসহ তাঁর পরিবারের ৭ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। একইসঙ্গে তার পরিবারের সদস্যদের নামে ব্যক্তি মালিকানাধীন বা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবও স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে। হাসানাত আবদুল্লাহ ছাড়াও তার প্রয়াত স্ত্রী সাহান আরা আবদুল্লাহ, হাসানাতের তিন ছেলে- এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক সেরনিয়াবাত মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ, বরিশাল সিটির সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ, সেরনিয়াবাত আশিক আবদুল্লাহ, সাদিক আব্দুল্লাহর সহধর্মিণী লিপি আব্দুল্লাহ এবং তাদের পরিবারের আরেক সদস্য ফিরোজা সুলতানার ব্যাংক হিসাব স্থগিত করা হয়।
লেনদেন স্থগিত করার এ নির্দেশের ক্ষেত্রে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা সংশ্লিষ্ট ধারা প্রযোজ্য হবে বলে বিএফআইইউয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে। চিঠিতে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ তার পরিবারের ৭ সদস্যের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দেওয়া হয়েছে।
বিএফআইইউয়ের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, যে-সব হিসাব স্থগিত করা হয়েছে তাদের হিসাবসংশ্লিষ্ট তথ্য বা দলিল- যেমন হিসাব খোলার ফরম, কেওয়াইসি ও লেনদেন বিবরণী যাবতীয় তথ্য চিঠি দেওয়ার তারিখ থেকে ২ কার্যদিবসের মধ্যে বিএফআইইউতে পাঠাতে হবে।’
আরো পড়ুন